স্থানীয়ভাবে প্রচলিত হিন্দুআনী কিংবদন্তীতে ও মুসলিম ঐতিহ্যে যথাক্রমে ‘দিনা’ নামে এক ব্রাক্ষন রাখাল কিংবা ‘দিনা’ নামে এক মুসলিম ফকিরের নামের ঘটনা থেকে এই স্থানের নাম দিনাজপুর হয়েছে বলে লোকেরা বিশ্বাস করে থাকে। কোম্পানি আমলেরই নথিপত্রে প্রথম দিনাজপুর নামটি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। তবে ভৌগলিকভাবে দিনাজপুর মৌজাটি অতি প্রাচীন। (বলাবাহুল্য বুকানন কথিত‘দিনওয়াজ’ নামে অজ্ঞাত রাজার কোন সুত্রে দিনাজপুর নামকরণের ঐতিহাসিক সন্ধান পাওয়া যায় না।)
ইংরেজ অধিকার পূর্ব যুগে প্রায় সমগ্র উত্তরবঙ্গ এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল নবাব শাসিত ঘোড়াঘাট সরকার এবং সরকারের শাসনাধিকার ছিল ঘোড়াঘাট নগর। পলাশী যুদ্ধের ০৮ (আট) বছর পর ১৭৬৫ খ্রিঃ ইংরেজ সেনাবাহিনী কর্তৃক অত্র এলাকা বিজিত হয়, ফলে নবাবী শাসনের অবসানের সঙ্গে পতন হয় সাবেক রাজধানী ঘোড়াঘাট নগরের। ঘোড়াঘাটের পতন হওয়ার ফলে বিজয়ী কোম্পানী সরকার কর্তৃক উত্তরবঙ্গ শাসনের জন্য যে বৃহৎ স্থায়ী জেলা গঠিত হয় তার শাসনাধিকারণ বা জেলা শহর স্থাপিত হয় দিনাজপুর নামক মৌজায়।
উত্তরে হিমালয়ের সানুদেশের সন্নিকটে এবং দক্ষিনের সমুদ্র সীমা থেকে অনেকটা দুরত্বে একটা ভৌগলিক ভারসাম্যময় ভুমির উপর বিদ্যমান মোটামুটি নৈসর্গিক বিপদ-আপদ মুক্ত শহরটির অবস্থান।
১ এপ্রিল, ১৮৬৯ খ্রিঃ প্রায় ৪ (চার) বর্গমাইল এলাকা নিয়ে দিনাজপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পদাধিকার বলে এর প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ প্যাটারসন। তখন জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ১০/১২ হাজার। ১৮৭২ খ্রিঃ প্রথম সরকারী ভাবে আদমশুমারীতে জনসংখ্যা ১৩,৭৮২ জন গননা কবা হয়। ১৮৯৮ খ্রিঃ সরকারী নিয়ন্ত্রন মুক্ত হয়ে পৌরসভার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। করদাতাদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে দিনাজপুরের তৎকালীন মহারাজা গিরিজা নাথ রায় পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা স্কুলের একটি কক্ষে পৌরসভার দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও ১৯০৩ খ্রিঃ বর্তমান পৌরভবনটি নির্মিত হয়। দৈর্ঘ্য প্রস্থ যথাক্রমে ৫র্০ ও ৪৫র্ আয়তাকার গথিক ডিজাইনে ০৬ কক্ষ বিশিষ্ট দক্ষিনমুখী কক্ষে উচু প্লিন্থথের উপর ভবনটি নির্মিত। বর্তমানে দিনাজপুর পৌরসভা ১২ (বার) টি ওয়ার্ড সমম্বয়ে একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা যার আয়তন ২৪.৫০ বর্গ কিলোমিটার, লোক সংখ্যা-১,৮৬,৭২৭ জন। প্রায় ০.৭৫ একর জমির উপর অতি পুরাতন তিনটি ভবনে পৌরসভার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দিনাজপুর পৌjরসভায় শিশুদের চিত্ত বিনোদনের জন্য একটি শিশু পার্ক আছে। এখানে এটি বাস টার্মিনাল, একটি ট্রাক টার্মিনাল, একটি খেয়া ঘাট ও চারটি হাট বাজার রয়েছে।
ইহা ছাড়াও দিনাজপুর ইন্সটিটিউট, রায় সাহেবের বাড়ীj,রাজবাড়ী, শুক সাগর, মাতা সাগর, জুলুম সাগর, গোর-এ শহীদ ময়দান, ষ্টেশন ক্লাব ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক নিদর্শন স্বরূপ স্থাপনা সমুহ পর্যটকদের আকর্ষন করে থাকে। উল্লেখ্য যে, অতি সম্প্রতি গোর-এ শহীদ ময়দানে নির্মিত কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান এশিয়া উপমহাদেশের মধ্যে সর্ববৃহৎ ঈদগাহ মিনার হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার মত দিনাজপুরও মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, কিন্ত ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত হিন্দুরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেশ বিভাগের পর থেকে দিনাজপুর শহর মুসলিম অধ্যুষিত হতে থাকে। বিংশ শতাব্দির প্রথম দিক থেকে ক্রমবর্ধমান গতিতে শহরের আয়তন সহ ব্যবসা বানিজ্য, দোকান পাট, শিক্ষা সংস্কৃতি প্রভৃতির কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বর্তমান অবস্থায় এসে পৌছায়। বর্তমানে প্রকৌশল, প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পরিচ্ছন্ন বিভাগ এর আওতায় ১২টি শাখার সমন্বয়ে জনসাধারণকে পৌরসেবা প্রদান করা হচ্ছে।